অস্ট্রেলিয়ার সিডনির অন্যতম প্রাচীন সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়া আবারও নতুন উদ্যম ও নতুন নেতৃত্ব নিয়ে বাংলাদেশি কমিউনিটির মাঝে ফিরে এসেছে। ১৯ শে জুলাই ডিনার ও কালচারাল নাইট।
আতিকুর রহমান।। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ইতিহাসে এমন কিছু সংগঠনের নাম আছে, যেগুলো শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি সময়ের স্মৃতি, আবেগ ও ঐক্যের প্রতীক। সিডনির বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়া ঠিক তেমনই একটি সংগঠন। দীর্ঘদিনের নীরবতার পর সংগঠনটি আবারও নতুন নেতৃত্ব ও নতুন প্রত্যয় নিয়ে কমিউনিটির সামনে ফিরে এসেছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।
১৯৯০-এর দশকে সিডনির বাংলাদেশি কমিউনিটির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়াঙ্গনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই সংগঠন। সে সময় কমিউনিটির অনুষ্ঠান মানেই ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়ার আয়োজন। এখনও অনেকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে ১৯৯৫-৯৬ সালের সেই ঐতিহাসিক নির্বাচন, যেখানে প্রায় ১,২০০ সদস্যের অংশগ্রহণ ছিল। প্রবাসে কোনো বাংলাদেশি সংগঠনের জন্য এমন ব্যাপক গণ সম্পৃক্ততা আজও বিরল।
তৎকালীন নেতৃত্বের স্বপ্ন ছিল আরও বড়। শুধু অনুষ্ঠান আয়োজন নয়, সিডনিতে একটি স্থায়ী বাংলাদেশি কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে তারা কাজ শুরু করেছিলেন। আজম-মোস্তফা পরিষদের উদ্যোগে অল্প সময়ের মধ্যেই একটি উল্লেখযোগ্য তহবিল গড়ে ওঠে, যা কমিউনিটির মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল।
ক্রীড়াঙ্গনেও সংগঠনটির অবদান ছিল অনস্বীকার্য। আজাদ গোল্ড কাপ শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট ছিল না; এটি ছিল কমিউনিটির মিলনমেলা। খেলাকে ঘিরে তৈরি হতো উৎসবের আবহ, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একত্রিত হতো। মাঠের প্রতিযোগিতার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সম্পর্ক ও বন্ধনও ছিল এই আয়োজনের অন্যতম অর্জন।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে নানা বাস্তবতার কারণে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংগঠনটি তার পূর্বের অবস্থান ফিরে পায়নি। ফলে একটি সম্ভাবনাময় অধ্যায় দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে ছিল।
সেই স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও নতুন সূচনার উদ্যোগ নিয়েছেন সংগঠনের সাবেক সদস্য ও বিশিষ্ঠ সংগঠন মনিরুল হক জজ এবং আলমগীর ইসলাম, মাহফুজুল হক খসরু, মোবারক হোসেন, তিসা তানিয়াসহ প্রবীন ও তরুণ উদ্যমী নেতৃত্ব। নবনির্বাচিত কমিটি ইতোমধ্যেই সংগঠনকে সক্রিয় করতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারই অংশ হিসেবে আগামী ১৯ জুলাই, রবিবার মিন্টোতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বার্ষিক ডিনার ও কালচারাল নাইট।
এই আয়োজনকে ঘিরে কমিউনিটিতে ইতোমধ্যেই উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। জনপ্রিয় শিল্পী মেহেদী হাসান ও অন্দ্রিলা আহমেদের সংগীত পরিবেশনা, নাট্যকার বেলাল ডালি-এর রচনা ও পরিচালনায় নাটক ‘প্রবাসীর পাংথা’, সিডনির পরিচিত নাট্যশিল্পীদের অংশগ্রহণ এবং আকর্ষণীয় র্যাফেল ড্র সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়, বরং প্রবাসী বাংলাদেশিদের পুনর্মিলনের একটি উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারে। অনুষ্ঠানে সরকারি প্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং কমিউনিটির বিশিষ্টজনদের উপস্থিতিও এর গুরুত্ব বাড়িয়ে দেবে।
তবে একটি সফল অনুষ্ঠানের চেয়েও বড় বিষয় হলো—এই পুনর্জাগরণ কতটা স্থায়ী হয়। একটি সংগঠনের প্রকৃত শক্তি কেবল নেতৃত্বে নয়, সদস্যদের আস্থা, অংশগ্রহণ এবং ঐক্যের মধ্যেই নিহিত। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি নতুন নেতৃত্ব সকলকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে, তবে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়া আবারও কমিউনিটির প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে।
প্রবাসে একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ কমিউনিটি গড়ে তুলতে এমন প্রতিষ্ঠানের বিকল্প নেই। হয়তো একদিন বাস্তবায়িত হবে বহুদিনের সেই স্বপ্ন—সিডনিতে প্রতিষ্ঠিত হবে একটি স্থায়ী বাংলাদেশি কমিউনিটি সেন্টার। আবারও ফিরে আসবে আজাদ গোল্ড কাপের মতো প্রাণবন্ত ক্রীড়া আয়োজন, সমৃদ্ধ হবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, আর নতুন প্রজন্ম খুঁজে পাবে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে সংযোগের একটি শক্ত ভিত্তি।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়ার এই নতুন যাত্রা তাই শুধু একটি সংগঠনের পুনরুত্থান নয়; এটি হতে পারে পুরো প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির নতুন আশার সূচনা। এখন দেখার বিষয়, এই আশাকে কতটা সফল বাস্তবতায় রূপ দিতে পারে নতুন নেতৃত্ব।

No comments